
:: আয়শা সিদ্দিকা হিমি ::
একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে তার প্রতিটি নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে। কিন্তু আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কি সেই সাম্যের প্রকৃত প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই? আজ যখন আমরা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতার দাবি করছি, তখন লিঙ্গভেদে বৈষম্য কিংবা জাতিগত পরিচয়ের কারণে অধিকার খর্ব হওয়া কেবল দুঃখজনকই নয়, বরং তা একটি রাষ্ট্রের জন্য চরম অবমাননাকর।
আজ সময় এসেছে সেই অমীমাংসিত সত্য নিয়ে কথা বলার, যা আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত। বাংলাদেশে আজ নারী হিসেবে বেঁচে থাকা কিংবা একজন সংখ্যালঘু জাতিসত্তার সদস্য হিসেবে টিকে থাকা, উভয়ই যেন এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, কীভাবে লিঙ্গভেদে নারীদের সুযোগ-সুবিধা সংকুচিত করা হচ্ছে এবং কীভাবে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।
নারীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং স্বনির্ভরতা আজও এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। ঘরে ও বাইরে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যে ধরনের সুরক্ষা ও সংবেদনশীল সহযোগিতা পাওয়ার কথা, বাস্তবে তার প্রতিফলন যৎসামান্য। আইন ও প্রশাসনের উচিত নারীর প্রতি কেবল দয়া বা অনুকম্পা দেখানো নয়, বরং একজন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তার সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যখন নারীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং অর্ধেক জনগোষ্ঠী অন্ধকারে থেকে যায়।
একইভাবে, আমাদের দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো দীর্ঘকাল ধরে এক ধরণের পদ্ধতিগত বঞ্চনা ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরিচয় বা বিশ্বাসের অজুহাতে তাদের ভূমি দখল, সামাজিক বর্জন কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আমাদের জাতীয় সংহতির জন্য এক অশনি সংকেত। রাষ্ট্র যখন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় উদাসীনতা দেখায়, তখন সেই গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
এই গভীর বৈষম্য দূর করার একমাত্র পথ হলো, এদেশের সকল নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা প্রান্তিক জাতিসত্তা, যাদেরই অধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, তাদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচ্ছিন্ন লড়াই দিয়ে বড় কোনো সামাজিক রূপান্তর সম্ভব নয়। যখন সকল শোষিত মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ে সম্মিলিত সংহতি প্রকাশ করবে, তখনই শাসনযন্ত্র এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের অন্যায় অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হবে।
সবশেষে, একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র গঠনে আমাদের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত কেবলই ‘নাগরিক’। লিঙ্গ, বর্ণ বা ধর্ম যেন কোনো মানুষের অধিকারের মাপকাঠি না হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিটি সংস্থাকে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং প্রতিটি মানুষের জন্য অভিন্ন আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে যেখানে বৈচিত্র্য হবে আমাদের শক্তি এবং সমঅধিকারের ছায়াতলে প্রতিটি মানুষ নির্ভয়ে জীবন যাপন করতে পারবে। বিভেদ নয়, সমতাই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।
আপনার মতামত লিখুন :