
চট্টগ্রাম বন্দরে মাশুল একলাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পেশাজীবীদের একাংশ বলছেন—এই সিদ্ধান্ত মূলত বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দিতে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সরকার বলছে—যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাশুল বৃদ্ধি অপরিহার্য ছিল।
বিতর্কের সূচনা
চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। তখন বড় কোনো বিতর্ক দেখা দেয়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
সরকার সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড–এর হাতে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়—তা-ও কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই জি-টু-জি প্রক্রিয়ায়। এতে রাজনৈতিক মহলে ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
এ বছরের মার্চে বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠন ও বাম গণতান্ত্রিক জোট বন্দর এলাকায় আন্দোলনে নামে। এর মধ্যেই সরকার ১৪ সেপ্টেম্বর বন্দর সেবার মাশুল ৪১ শতাংশ বাড়ায়, যা ১৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়।
মাশুল বৃদ্ধিতে কারা আপত্তি তুলেছেন
প্রথম আপত্তি আসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। “চট্টগ্রামের সর্বস্তরের ব্যবসায়ীবৃন্দ” ব্যানারে তারা ১২ অক্টোবর সভা করে অভিযোগ তোলেন, মাশুল বাড়ানোর পেছনে বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে।
পরে ২১ অক্টোবর চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরাম-এর ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ব্যবসায়ীরা হুঁশিয়ারি দেন—বিদেশি অপারেটরদের সুবিধার জন্য মাশুল বাড়ানো হলে তারা নিয়োগের বিরুদ্ধেও আন্দোলন করবেন।
শ্রমিক ও নাগরিক সংগঠনগুলোও “বন্দর রক্ষায় চট্টগ্রামের শ্রমিক–ছাত্র–পেশাজীবী–নাগরিকবৃন্দ” ব্যানারে আন্দোলন শুরু করে। তারা অভিযোগ করেন, বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা মুনাফা করা একটি প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে সরকার জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা চাপাচ্ছে।
বিদেশি অপারেটর নিয়োগ ও মাশুল বৃদ্ধির যোগসূত্র
বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (IFC) এ বছরের এপ্রিলে এক প্রতিবেদনে বলেছিল—চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামো বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। এর পরপরই মাশুল বৃদ্ধির প্রক্রিয়া গতি পায়।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এটি সরাসরি বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে—গত ৪০ বছরে মাত্র একবার (২০০৭ সালে) পাঁচটি খাতে মাশুল বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও মানবসম্পদ ব্যয় বহুগুণে বেড়েছে এবং বন্দর প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে প্রায় ৩৩ হাজার ৩২১ কোটি টাকা প্রয়োজন। তাই মাশুল বাড়ানো যুক্তিসংগত।
কে লাভবান হবে—বন্দর নাকি বিদেশি অপারেটর?
চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল দুই ভাগে বিভক্ত—
১️⃣ সি-সাইড (জলসীমা) সেবা — যেমন পোর্ট ডিউজ, পাইলটেজ, টাগ ভাড়া ইত্যাদি, যা বন্দর কর্তৃপক্ষ পায়।
২️⃣ ল্যান্ডসাইড (টার্মিনাল) সেবা — যেমন কনটেইনার ওঠানো-নামানো, পরিবহন, সংরক্ষণ ইত্যাদি, যা বিদেশি অপারেটররা আদায় করতে পারে।
বন্দরের মোট আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই টার্মিনালকেন্দ্রিক। ফলে মাশুল বাড়ার সুফল সবচেয়ে বেশি যাবে বিদেশি অপারেটরদের কাছে। বন্দর এর তুলনায় কম সুবিধা পাবে, যদিও অপারেটরদের আয় থেকে কিছু অংশ বন্দর পাবে।
মাশুল বৃদ্ধিতে খরচ কতটা বেড়েছে
২০২৩–২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারে গড়ে ৩৯ ডলার (প্রায় ৪,৩৯৫ টাকা) বাড়তি খরচ হচ্ছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব বলছে, বাড়তি ব্যয় গড়ে ৩,৮০০ টাকা, যা পণ্যের কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ১২ পয়সা দামে প্রভাব ফেলবে।
ভোক্তা ও রপ্তানিকারকের ওপর প্রভাব
শিপিং এজেন্টরা বন্দরকে মাশুল দিয়ে তা ভাড়ার সঙ্গে আমদানিকারক–রপ্তানিকারকের কাছ থেকে আদায় করে নেয়। ফলে মাশুল বৃদ্ধির পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।
এক সময় শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি ৪৫–১০০ ডলার সারচার্জ নিতে চেয়েছিল, পরে তা প্রত্যাহার করে নিলেও বাড়তি খরচ ভাড়ার সঙ্গে আদায় করছে।
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, বিদেশি ক্রেতারা এখন পণ্যের দাম কমিয়ে বাড়তি খরচ সমন্বয় করতে চাইবেন। এতে প্রতিযোগিতামূলক দামে রপ্তানি পণ্য বিক্রি কঠিন হয়ে পড়বে।
আঞ্চলিক তুলনায় চট্টগ্রামের অবস্থান
IFC–এর মার্চের প্রতিবেদনে ৭টি দেশের ১৪টি বন্দরের ট্যারিফ তুলনা করা হয়।
তাতে দেখা যায়, মাশুল বৃদ্ধির আগে চট্টগ্রামে গড়ে প্রতি কনটেইনারে খরচ ছিল ১২৬.৬৬ ডলার, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি বন্দরের চেয়ে বেশি।
নতুন ট্যারিফ কার্যকর হলে ব্যয় বাড়বে আরও ৪৭ ডলার, ফলে চট্টগ্রাম বন্দর আঞ্চলিকভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল বন্দরে পরিণত হচ্ছে।
বিদেশি অপারেটর নিয়োগের অগ্রগতি
বন্দর চারটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করছে—
লালদিয়া টার্মিনাল: নেদারল্যান্ডসের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে নভেম্বরের মাঝামাঝি চুক্তির সম্ভাবনা।
নিউমুরিং টার্মিনাল: ডিসেম্বর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি হতে পারে।
বে টার্মিনাল: সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
পানগাঁও টার্মিনাল (ঢাকা): অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর হিসেবে বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিরোধ ও সরকারের অবস্থান
সরকার এখনো অনড় অবস্থানে আছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
বন্দর এলাকায় ১১ অক্টোবর থেকে এক মাসের জন্য সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ।
‘শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)’ ১ নভেম্বর গণ-অনশন করেছে, ব্যবসায়ীরা ১৯ অক্টোবর চার ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর তারা কর্মসূচি স্থগিত করেন।
বিশ্লেষকদের মতামত
মোস্তাফিজুর রহমান (সিপিডি): মাশুল ধাপে ধাপে বাড়ানো উচিত ছিল। একবারে বৃদ্ধিতে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ভোক্তার ওপরও চাপ পড়বে।
মো. জাফর আলম (সাবেক সচিব): বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীর স্বার্থ সমন্বয় করে মাশুল নির্ধারণের জন্য স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠন করা দরকার।
আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী (পোর্ট ইউজার্স ফোরাম): চার বছরে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে টাকার হিসেবে আগেই ৪২% খরচ বেড়েছে, নতুন মাশুল অযৌক্তিক।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ: বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে মাশুল বাড়ানো হয়েছে, এতে দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তা উভয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এম সাখাওয়াত হোসেন (নৌপরিবহন উপদেষ্টা): ৪০ বছর পর মাশুল বাড়ানোই যৌক্তিক পদক্ষেপ; ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে, অভিযোগের ভিত্তি নেই।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বৃদ্ধি এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। সরকার বলছে—এটি সময়ের দাবি, কিন্তু ব্যবসায়ী–শ্রমিকদের মতে, সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করবে।
বিদেশি অপারেটর নিয়োগ, বাড়তি মাশুল, এবং বন্দর পরিচালনার নতুন কাঠামো—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি এখন বড় এক রূপান্তরের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আপনার মতামত লিখুন :