
:: হাজী মোঃ আমিনুল ইসলাম ::
আজ ১৬ ডিসেম্বর—মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর একটি। ১৯৭১ সালের এই দিনে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে এবং পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অসংখ্য মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় শুধু একটি ভূখণ্ডের মুক্তি নয়—এটি ছিল শোষণ, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক মানবিক অভ্যুত্থান।
পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যই মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। রাজস্ব আয়ে এগিয়ে থেকেও বাজেট বরাদ্দে বঞ্চনা, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে উপেক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত—সব মিলিয়ে বাঙালি জাতিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এক চূড়ান্ত প্রতিরোধের পথে। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা সেই প্রতিরোধকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ দেয়।
এ বছর বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান এবং ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি প্রথম বিজয় দিবস। ফলে এবারের বিজয় দিবস শুধু অতীতের স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে অঙ্গীকার করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমরা বারবার সেই চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েছি। ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, বৈষম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা জাতিকে হতাশ করেছে। তাই আজ বিজয় দিবসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি?
এই বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠন, যেখানে আইনের শাসন থাকবে সর্বাগ্রে; নির্বাচন হবে অবাধ ও সুষ্ঠু; রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের সম্মতিতে; এবং কোনো নাগরিক পরিচয়, মত বা বিশ্বাসের কারণে বৈষম্যের শিকার হবে না। তরুণ সমাজ, যারা সাম্প্রতিক আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রেখেছে, তাদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলধারায় যুক্ত করাও আজ সময়ের দাবি।
মহান বিজয় দিবস আমাদের শেখায়—ঐক্য, ত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তা থাকলে যে কোনো অন্যায়কে পরাজিত করা সম্ভব। অতীতের গৌরবকে স্মরণ করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়াই বিজয় দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য। আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘোষণা করি—এই দেশকে আর কখনো স্বৈরাচার, বৈষম্য ও দুঃশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হবে না।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বাংলাদেশের কণ্ঠ
আপনার মতামত লিখুন :