
ভ্যাট আদায় বাড়াতে নতুন করে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনা, বড় ভ্যাটদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, ডিজিটাল ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো এবং ভ্যাট ফাঁকি ধরতে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত ভ্যাট আদায়ের পথ আরো সহজ করার চেষ্টা করছে এনবিআর।
এনবিআরের হিসাবে মোট ভ্যাট আদায়ের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে ১১টি খাত থেকে। এ কারণে এসব খাতের প্রতিষ্ঠানকে অনলাইন রিটার্নের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে সিগারেট, মোবাইল ফোন, ওষুধ, পানীয়, সিমেন্ট, এমএস পণ্য, টাইলস এবং রং ও বার্নিশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। সেবার মধ্যে রয়েছে বীমা, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল আর্থিক সেবা।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর এনবিআরের এক আদেশে বলা হয়েছিল, সিগারেট, ওষুধ, মোবাইল ফোন ও ব্যাংকিংসহ ১১টি খাতে অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। খাতগুলো হলো সিগারেট, মোবাইল ফোন, এমএস পণ্য, ওষুধ, পানীয়, সিমেন্ট, টাইলস, রং ও বার্নিশ, বীমা, ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিংসেবা প্রদানকারী খাত এবং মোবাইল ব্যাংকিংসেবা প্রদানকারী খাত।
এনবিআরের আদেশে আরো বলা হয়, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৬৪-এর উপধারা (৫) এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ১১৮(ক) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বর্ণিত খাতগুলোর ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদনকারীদের এবং বর্ণিত সেবা খাতগুলোর ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-ভ্যাট পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে দাখিলপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা হলো। যদি কোনো নিবন্ধিত ব্যক্তি উপরোল্লিখিত পণ্য বা সেবার পাশাপাশি অন্য কোনো পণ্য বা সেবা সরবরাহ কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত থাকেন, তবে তার ক্ষেত্রেও এই আদেশ প্রযোজ্য হবে।
আদেশে আরো বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনলাইনে দাখিলপত্র পেশ বাধ্যতামূলক-সংক্রান্ত ইতিপূর্বে কোনো আদেশ জারি করে থাকলে, এই আদেশ জারির পর ওই আদেশগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে।
এনবিআর জানিয়েছে, বর্তমানে মোট ভ্যাট রিটার্নের প্রায় ৬০ শতাংশ অনলাইনে জমা হচ্ছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ধাপে ধাপে অনলাইন ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে যেসব খাত থেকে বড় অঙ্কের ভ্যাট আসে, সেসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য অনলাইনে পাওয়া গেলে রাজস্ব কর্মকর্তাদের জন্য তথ্য যাচাই ও নজরদারি করা সহজ হবে।
শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি নয়, নতুন করদাতাও বাড়ানোর চেষ্টা করছে এনবিআর। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ২৭ হাজার ৪০১টি নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন নিয়েছে। তবে নতুন নিবন্ধনের পর এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করছে কি না এবং যথাযথ ভ্যাট পরিশোধ করছে কি না সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লেই রাজস্ব বাড়বে না।
নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত ব্যবসা ও লেনদেনের সঙ্গে তাদের দেওয়া ভ্যাটের হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি। এ জন্য নিবন্ধনের পর নিয়মিত রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট পরিশোধ নিশ্চিত করার ওপরও নজর দিচ্ছে এনবিআর।
এদিকে ভ্যাট ফাঁকি ধরতে মাঠ পর্যায়ে অভিযানও বাড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে গোপন বিক্রয়, পণ্যের ভুল শ্রেণিবিন্যাস এবং কম ভ্যাট দেখানোর মতো অনিয়ম ধরা পড়ছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাটের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে পুরনো বকেয়া এখনো বড় বিষয়। নতুন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হলেও পুরনো করদাতাদের কাছ থেকে নিয়মিত ভ্যাট আদায় এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া আদায় করা না গেলে মোট রাজস্বে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না।
এদিকে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। জুলাই থেকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ফলে জুলাই ও আগস্ট মাসের লেনদেনের রিটার্ন দাখিল ও ভ্যাট পরিশোধের সময় সেপ্টেম্বর মাসে পড়েছে। নতুন এই ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করছে এনবিআর। এরই মধ্যে আবার মাসিক রিটার্ন ও অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ভ্যাট আদায়ের সামপ্রতিক হিসাবেও কিছুটা কমতির চিত্র দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। গত বছরের একই মাসে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। আগস্টে আদায় হয়েছে আট হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা।
তবে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট আদায় শুরু হওয়ায় শুধু জুলাই ও আগস্টের হিসাব দিয়ে নতুন ব্যবস্থার প্রভাব বিচার করতে চাইছে না এনবিআর। এ বিষয়ে এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট নীতি) মো. আজিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু এবার ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট আদায় হচ্ছে, সেহেতু সেপ্টেম্বর শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে ভ্যাট আদায়ের যে তথ্য আসছে, তা পজিটিভ।’
এনবিআরের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য এখন করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকে নিয়মিত ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করা। অনলাইন রিটার্ন, ডিজিটাল নজরদারি ও মাঠ পর্যায়ের অভিযান—এই তিন দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে বকেয়া ভ্যাট আদায় করতে পারলে রাজস্ব আহরণ আরো বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে ভ্যাট থেকে দুই লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর। এই লক্ষ্য পূরণে নতুন করদাতা যুক্ত করার পাশাপাশি বড় খাতগুলোর লেনদেনের ওপর নজরদারি, নিয়মিত রিটার্ন দাখিল এবং বকেয়া ভ্যাট আদায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা এবং ডিজিটাল নজরদারির পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ আগামী মাসগুলোতে ভ্যাট আদায়ের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা মাত্র দুই মাসের মাথায় বাইরে থেকে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। এনবিআর যে উদ্যোগ নিয়েছে, নিশ্চয়ই এর পেছনে তাদের যৌক্তিকতা রয়েছে। সময়ের সঙ্গে এর ফলাফল স্পষ্ট হবে এবং এনবিআরই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবে।’
তিনি বলেন, ‘সবাইকে ভ্যাটের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে আদায় করা ভ্যাট যাতে সঠিকভাবে ও সময়মতো সরকারি কোষাগারে জমা হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অটোমেশন হলে এই দুই কাজই সহজ হবে। তাই এই মুহূর্তে পুরো ভ্যাট ব্যবস্থাকে অটোমেশনের আওতায় আনাই জরুরি।’
আপনার মতামত লিখুন :