লক্ষাধিক সেনা নিয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামছে সৌদি


বাংলাদেশের কণ্ঠ ডেস্ক প্রকাশের সময় : অক্টোবর ৩, ২০২৬, ৫:৪১ অপরাহ্ন /
লক্ষাধিক সেনা নিয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামছে সৌদি

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ করতে বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে উপকূলীয় অভিযান অথবা ইয়েমেনের একাধিক ফ্রন্টে একযোগে হামলার মতো কয়েকটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে রিয়াদ। আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয়জনের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই অভিযান শুরু হতে পারে। অভিযানে সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে থাকা ইয়েমেনি বাহিনী স্থলভাগে নেতৃত্ব দেবে এবং তাদের সহায়তা করবে সৌদি বিমান হামলা।

নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তিরা জানান, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। এ ছাড়া কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে সৌদি আরবের মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না।

২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে দেশটির গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। ওই সরকারকে রাজধানী সানা থেকে উৎখাত করেছিল হুতিরা। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হয়, যা এ বছর পর্যন্ত মোটামুটি কার্যকর ছিল। তবে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হুতিরা সৌদি আরবের জাহাজ ও তেল অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করার পর পরিস্থিতির অবনতি হয়।

বাব আল-মান্দেব পুনর্দখলের লক্ষ্য

সৌদি অভিযানের একটি প্রধান লক্ষ্য হলো গত মাসে হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা ঠেকানো। পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হুতিরা উপকূল ধরে এগিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরব দুটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। এর একটি হলো বাব আল-মান্দেবের আশপাশের এলাকায় সীমিত অভিযান। অন্যটি হলো ইয়েমেনের আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশে একযোগে একাধিক ফ্রন্টে আরও বড় অভিযান চালানো।

অভিযানের পরিসরের ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনাকে এতে মোতায়েন করা হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সৌদি ও ইয়েমেন সরকার, হুতি গোষ্ঠী এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্ররা সৌদি আরবের এই পরিকল্পনা নিয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি।

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ এ বছর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব বেড়েছে।

পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার ভাষ্য, হুতিরা বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে নতুন করে শান্তি আলোচনা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছে রিয়াদ। কারণ এর ফলে হুতিদের হাতে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরি হয়েছে।

সৌদি অভিযানের সুনির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছয়জন কোনো নির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি। তাঁদের অনুমান, অভিযান এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হতে পারে অথবা নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত তা পিছিয়ে যেতে পারে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, তাঁর ধারণা, অভিযানটি সীমিত পরিসরের হবে এবং ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় অনেক ছোট হবে।

তিনি বলেন, হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করতে চাইলেও সৌদি আরবের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাব আল-মান্দাবের উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণের আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া। তাঁর মতে, আদর্শভাবে অভিযানটি উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল এবং স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনার জন্য সীমিত হওয়া উচিত।

গত তিন বছরে লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তি কমে যাওয়ার পর হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে।

হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি সংঘাতের কেন্দ্র তৈরি করতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর এবং পরবর্তী সময়ে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর থেকেই অঞ্চলটি সংঘাতে জর্জরিত।

ট্রাম্প, তুরস্ক ও পাকিস্তান

সৌদি আরবের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে সৌদি বিমান অভিযানে সহায়তার জন্য সামরিক উপদেষ্টা এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্যসহ গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে বলে এক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন।

তবে এই সহায়তার পরিসর সীমিত হতে পারে। এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, সৌদি আরবের কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের সরাসরি সামরিক সহায়তা, যেমন বিমান হামলা চালানোর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত মাসে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। পাকিস্তানি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, এই দুই দেশ সৌদি আরবকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে, যা ইয়েমেনে ব্যবহার করছে রিয়াদ।

পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, গত মাসে পাকিস্তান চারটি কার্গো বিমানযোগে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারের সদর দপ্তর এডেনে পাঠিয়েছে।

দ্বিতীয় এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা এবং এক পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তা দিতে সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সেখানে অবস্থান করছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরব কেনা তুরস্কের তৈরি ড্রোনও ইয়েমেনে মোতায়েন করা হয়েছে।

ইয়েমেনে নতুন অভিযান শুরু করলে সৌদি আরবের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে দেশটির তেল স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো কীভাবে রক্ষা করা হবে। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য রিয়াদ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে।

দ্বিতীয় পাকিস্তানি কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের স্থলসীমান্ত রক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পাকিস্তান দেশটিতে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। গত বছর থেকে কয়েক ধাপে এসব সেনা সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনার পরও সেনা পাঠানো হয়েছে।

তবে ইয়েমেনে যুদ্ধের জন্য সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত পাকিস্তান নেয়নি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রিয়াদকে তাদের সামরিক সহায়তা নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

এদিকে ফ্রান্স জানিয়েছে, লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় সহায়তার জন্য তারা সৌদি আরবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা পাঠাবে।

বিভক্ত ইয়েমেনি বাহিনী

ইয়েমেনের ভেতরে যেকোনো স্থল অভিযান নির্ভর করবে দেশটির বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর। গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। পরে যুদ্ধ রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থায় পৌঁছায়।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশা বলেন, হুতিদের পেছনে ঠেলে দিতে প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের জন্য অনেক হুতিবিরোধী বাহিনী এখনো সংগঠিত বা প্রস্তুত নয়। একই সময়ে হুতিরা একাধিক ফ্রন্টে চাপ তৈরি করছে।

গত শীতে ইয়েমেনি বাহিনীর বিভক্তি আরও বেড়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় যোদ্ধারা পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা দখল করে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দেওয়ার চেষ্টা করলে সৌদি-সমর্থিত যোদ্ধাদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছে তারা পরাজিত হয়।

সৌদি সরকারের নীতিনির্ধারণের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলি শিহাবি সতর্ক করে বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে স্থলবাহিনীর কার্যক্রমের ওপর।

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত অগ্রাধিকার ছিল স্থলভাগে অবস্থান রক্ষা করা এবং যুদ্ধের ফ্রন্ট স্থিতিশীল করা। তবে তারা অবশ্যই আক্রমণে যাবে। সাফল্য অনেকটাই স্থানীয় বাহিনীর কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।’