বাংলাদেশে নারীরা কেন নিরাপদ ও স্বাধীন নয়?


বাংলাদেশের কণ্ঠ ডেস্ক প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৭, ২০২৪, ২:৫২ অপরাহ্ন /
বাংলাদেশে নারীরা কেন নিরাপদ ও স্বাধীন নয়?

:: আয়শা সিদ্দিকা হিমি ::

একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি হলো সেই দেশের নারীর সামাজিক ও আইনি অবস্থান। কিন্তু ২০২৪ সালে এসেও আমাদের সামনে বড় এক প্রশ্ন, বাংলাদেশে নারী কি সত্যিই নিরাপদ? প্রতিদিনের খবরের কাগজ খুললে নারীর প্রতি সহিংসতার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে, তা আমাদের উন্নয়নের দাবিকে বারবার উপহাস করে। কেন স্বাধীনতার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরও নারীকে তার ঘর ও বাহিরের নিরাপত্তা নিয়ে আজীবন শঙ্কা নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে?

বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তাহীনতার পেছনে কেবল আইনি দুর্বলতা দায়ী নয়, বরং এর মূলে রয়েছে এক গভীর ও অন্ধকার মনস্তত্ত্ব। আমরা লক্ষ্য করছি, গত কয়েক বছর ধরে হেফাজতে ইসলামের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সুপরিকল্পিতভাবে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার চেষ্টা করছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা নারীকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করার যে ‘মধ্যযুগীয় প্রেসক্রিপশন’ সমাজকে দিচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজপথে নারীর বিচরণ, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ কিংবা উচ্চশিক্ষা লাভের আকাঙ্ক্ষাকে তারা ‘বেহায়াপনা’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে সমাজে এক ধরণের ভীতি ও বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি করছে।

এই উগ্রবাদী আদর্শ কেবল মাঠ পর্যায়ে হুঙ্কার দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সাধারণ মানুষের মনে নারীর স্বাধীনতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে দেয়। যখন কোনো রাজনৈতিক বা তথাকথিত ধর্মীয় মঞ্চ থেকে নারীর পোশাক, চালচলন বা চলাফেরা নিয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া হয়, তখন তা প্রকারান্তরে অপরাধীদের উস্কে দেয়। ফলে ঘর থেকে বের হওয়া প্রতিটি নারী আজ এক ধরণের সামাজিক ও মানসিক সহিংসতার শিকার। ঘর থেকে বাহির, সর্বত্রই নারী আজ নিরাপত্তাহীন।

দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এদেশের আইন ও তার প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই উগ্রবাদী হুমকির মুখে নারীর নূন্যতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধীদের যেমন দুঃসাহসী করছে, তেমনি উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সমাজের ওপর তাদের অন্ধকার শাসন চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। আইন যখন উগ্র শক্তির ভয়ে অথবা রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে নুয়ে পড়ে, তখন নারীর অধিকার আর স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

আজ সময় এসেছে এই অচলায়তন ভাঙার। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তা কেউ আমাদের হাতে তুলে দেবে না।এদেশের নারীদের নিজেদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে আজ ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। যখনই কোনো উগ্রবাদী শক্তি নারীর চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা বা ফতোয়া দিতে আসবে, আমাদের সম্মিলিতভাবে তার প্রতিবাদ করতে হবে। আমরা যদি আজ একজোট না হই, তবে এই অন্ধকার আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেও গ্রাস করে নেবে।

নারীর নিরাপত্তা কেবল তার ব্যক্তিগত লড়াই নয়, এটি একটি জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। যতদিন পর্যন্ত দেশের প্রতিটি নারী নির্ভয়ে উন্মুক্তভাবে চলাফেরা করতে না পারবে এবং প্রতিটি উগ্রবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান না নেবে, ততদিন প্রকৃত উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে। এখনই যথাযথ সময়, আমরা নারীরা একে অপরের ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর। আমাদের ঐক্যই হোক সব ধরণের মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।পরিবর্তন আসুক আমাদের সম্মিলিত বজ্রকণ্ঠে।