পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন উৎসব


বাংলাদেশের কণ্ঠ ডেস্ক প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১৪, ২০২৪, ৪:২৩ অপরাহ্ন /
পহেলা বৈশাখ সর্বজনীন উৎসব

:: হাজী মোঃ আমিনুল ইসলাম ::

পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি এই দিনটি পালন করে থাকেন। পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, বরং এটি বাঙালি জাতির ঐক্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক।

পহেলা বৈশাখ বছরের প্রথম দিন। এই দিনটি নতুন বছরের সূচনা হিসেবে পালিত হয়। নতুন বছরের শুরুতে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রতিজ্ঞা নেওয়া হয়। পহেলা বৈশাখ পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার দিন। এই দিনটিতে আমরা গত বছরের ভুলত্রুটিগুলো ভুলে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাই।

পহেলা বৈশাখ সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই দিনে সকলে মিলে আনন্দ-উৎসব করে থাকেন। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নিম্ন সকলের মধ্যে বৈষম্য ভুলে সকলে মিলে এই উৎসব পালন করা হয়।

পহেলা বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এই দিনে আমরা আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার, পোশাক, গান-বাজনা, নাচ-গান ইত্যাদির মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি প্রকাশ করে থাকি।

প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালিরা নববর্ষ উদযাপন করে আসছে। বৈদিক যুগে ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ নামে এই উৎসব পালিত হত। মধ্যযুগে ‘পয়লা বৈশাখ’ বা ‘নববর্ষ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। তখন ‘হালখাতা’ নামে ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলে নতুন হিসাব শুরু করতেন। মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালে ‘বঙ্গাব্দ’ নামে নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। তখন থেকেই ‘পহেলা বৈশাখ’ রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হতে থাকে।

ব্রিটিশ আমলে ‘পহেলা বৈশাখে’ সরকারি ছুটি ছিল না। তবে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই এই দিনটি উদযাপন করত। পাকিস্তান আমলে ‘পহেলা বৈশাখ’ উদযাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে বাঙালিরা গোপনে এই দিনটি উদযাপন করত।

এসেছে পহেলা বৈশাখ, ৩০ চৈত্রে ১৪৩০ বঙ্গাব্দ বিদায় নিয়েছে। এজন্য- ‘উড়ে যাক, দূরে যাক বিবর্ণ বিশীর্ণ জীর্ণ পাতা/বিপুল নিঃশ্বাসে।’ রবীন্দ্রনাথ ‘নববর্ষ’ প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘পুরাতনই চিরনবীনতার অক্ষয় ভাণ্ডার।…নূতনত্বের মধ্যে চিরপুরাতনকে অনুভব করিলে তবেই অমেয় যৌবনসমুদ্রে আমাদের জীর্ণ জীবন স্নান করিতে পায়।’ এই ‘চিরপুরাতন’ হলো আমাদের চিরায়ত ঐতিহ্য। আজকের এই নববর্ষের মধ্যে বাঙালির বহুসহস্র পুরাতন বর্ষকে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ সেখানে রয়েছে সম্রাট আকবর কর্তৃক বঙ্গাব্দ প্রচলনের ইতিহাস, সেখানে আছে গ্রামীণ বাংলার হালখাতা আর বৈশাখি মেলার আয়োজন, আছে বাঙালি জমিদারদের পুণ্যাহের উৎসব। ফসলের ঘ্রাণে গড়ে ওঠা আমার নববর্ষ শাশ্বত ও গৌরবের।

নববর্ষে বৈশাখের খররৌদ্রে অগ্নিস্নানে শুদ্ধ হয়ে উঠুক আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র। ‘হে নূতন, এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি/পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে-/ ব্যাপ্ত করি, লুপ্ত করি, স্তরে স্তরে স্তবকে স্তবকে/ ঘনঘোরস্তূপে।’ ‘ঘনঘোরস্তূপে’ নতুনের এই আহ্বান প্রকৃতপক্ষে সংকট কবলিত বাঙালির জীবনে প্রত্যাশার অভিব্যক্তি। এ মুহূর্তে আমরা পৃথিবীতে যতটুকু কাজ করি তা যেন সত্যসত্যই দায়িত্ব পালনের জন্য করি, ভান না করি। কারণ অক্ষমরা বৃহৎ কাজ করতে পারে না বরং বৃহৎ ভানকে শ্রেয়স্কর জ্ঞান করে। জানে না যে মনুষ্যত্বলাভের পক্ষে বড়ো মিথ্যার চেয়ে ছোটো সত্য ঢের বেশি মূল্যবান। এই সত্য পথে হেঁটে আমরা নববর্ষের চেতনায় সংকট জয় করব। আর এই বৈশাখেই মানবজীবনকে অশান্তি মুক্ত করার শপথ নিতে হবে। কারণ- বৈশাখে ‘মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বাংলাদেশের কণ্ঠ