
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভিন্ন রকমের ধারণা ছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকার পরও জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে সাধারণ মানুষের কিছু ধারণার ভিত্তিতে।
জামায়াত নেতাদের মানুষ অপেক্ষাকৃত সৎ মনে করে, তারা ধর্মকর্মে মনোযোগী এটাও ধর্মপ্রাণ অনেক মুসলিম পছন্দ করেন। কিন্তু জামায়াত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের এ পারসেপশন একটা বড় ধাক্কা খেল সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ) থেকে নির্বাচিত জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁস হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে।
দুই দিন গাজী নজরুলের এ ভিডিও সমাজমাধ্যম থেকে রাজনীতির মাঠে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। জামায়াত প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করতে চাইলেও গতকাল সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়।
নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
গতকাল বিকাল ৪টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি।
জামায়াতের এ সিদ্ধান্তের ফলে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। বৈঠকে বহিষ্কারের বিষয়টি অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ফলে নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে একজন রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এ ঘটনা ঘটনার পর জামায়াত যতই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিক না কেন, দলটির সৎ লোক আর সৎ মানুষের শাসনের স্লোগান বড় হোঁচট খেয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন-শেষ পর্যন্ত জামায়াতও? এ ঘটনা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে এনেছে।
তা হলো ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে সবারই অবক্ষয় হয়, এমনকি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের মধ্যেও পচন ধরে।
জামায়াত তাদের যে আদর্শিক অবস্থান নিয়ে এতদিন গর্ব করত, সেই গর্বে কিছুটা হলেও কালিমা লেগেছে। শুধু জামায়াত নয়, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর জন্যই এটা একটি সতর্কবার্তা। রাজনীতিবিদরা পাবলিক ফিগার। তারা সব সময় জনগণের সঙ্গে মেশেন।
ভারতের বরেণ্য রাজনীতিবিদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রাজনীতিবিদদের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু নেই, তাদের জীবন খোলা বইয়ের মতো।’
বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন লিখেছেন, ‘আমরা যারা রাজনীতিবিদ তারা সব সময় জনগণের নজরদারির মধ্যে থাকি।’ কোটি মানুষের চোখ থাকে রাজনীতিবিদদের চলাফেরা, কথাবার্তা এবং প্রতিটি কাজে। সারা বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাদের জন্যই এটা প্রযোজ্য। এ কারণেই মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে বিল ক্লিনটনের অন্তরঙ্গতা হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে জন আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এজন্য তাকে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হতে হয়।
কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো মার্কিন গায়িকা কেটি পেরির সঙ্গে প্রেম করার জন্য রাজনীতিকে বিদায় জানান।
পরকীয়া, রোমাঞ্চ কিংবা নৈতিক স্খলন আর রাজনীতি একসঙ্গে চলতে পারে না। জনগণ যেমন দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদদের প্রত্যাখান করে, তেমনই রাজনীতিবিদদের অনৈতিক কাজ ঘৃণা করে। সদ্য সাবেক জামায়াত নেতা যে কাজটি করেছেন তা শুধু অনৈতিক নয়, অন্যায়ও বটে।
আপনার মতামত লিখুন :