
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম শাহরিয়ারকে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান পরিবার। ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সামনে এসেছে তার মায়ের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের একটি ফেসবুক পোস্ট। ওই পোস্টে কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোডে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন ড. নাহিদা। পরে নিজের ফেসবুক পোস্টে সেদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।
Google News গুগল নিউজে ভোরের কাগজের খবর পড়তে ফলো করুন
পোস্টে ড. নাহিদা লিখেছিলেন, ‘স্পট থেকে এলাম, চোখের সামনে ছররা গুলি আর টিয়ারশেল নিক্ষেপ দেখলাম।’
তিনি জানান, আতঙ্কিত ছাত্রীদের ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন। আহত শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. নাহিদা লিখেছিলেন, ‘জানি কিছু করতে পারব না তবু আতঙ্কিত ছাত্রীদের ফোন পেয়ে দৌড়ে ছুটলাম, আহত ছাত্রদের জন্য হাতে পেস্ট নিয়ে ঘোরা ছাড়া করার কিছু ছিলও না।’
ওই পোস্টে নিজের অবস্থানও তুলে ধরেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, ‘আমি বিপ্লব আন্দোলন করা মানুষ না। করিও নাই ওইভাবে কখনো।’ তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রয়োজনের সময় তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
হল ছাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের পরামর্শও দেন ড. নাহিদা। কোনো ছাত্রী পথে সমস্যায় পড়লে কিংবা থাকার জায়গার প্রয়োজন হলে তাকে ফোন করার আহ্বান জানান তিনি। প্রয়োজনে তার কাছে থাকার ব্যবস্থা করা যাবে বলেও উল্লেখ করেন।
পোস্টের শেষ দিকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি লিখেছিলেন, ‘সবাই ভালো থাকুক।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই ঘটনার প্রায় দুই বছর পর নিজের একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন ড. নাহিদা। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল অপ্রতিম। এরপর তার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে ওই দিনই সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার। পরে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশও তার সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালায়।
প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও কারা এতে জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
‘ওই ছিল আমাদের সব’
রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গন্ধমতি ঈদগাহে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাসার পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
দাফনের আগে অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার আর নতুন করে কিছু বলার নেই, আমি কেবল আমার সন্তান হত্যার উপযুক্ত বিচার দেখতে চাই।’
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন মা ড. নাহিদা বেগমও। তিনি বলেন, ‘ওই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। ওর হাসি, ওর কথা, ওর ছোট ছোট আবদারেই আমাদের ঘরটা ভরে থাকত। আজ সেই ঘরেই ও নেই, ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই।’
অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করেন। তারা দ্রুত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
আপনার মতামত লিখুন :